ডায়বেটিস- খাবার এবং এর বৃত্তান্ত (১)

ডায়াবেটিস রোগিরা প্রায়ই শঙ্কিত থাকেন তাঁরা কি খাবেন আর কি খাবেন না, তা নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস হওয়া মানেই পছন্দের খাবারে রসনা বিলাস বন্ধ হয়ে যাওয়া। মুখরোচক খাবারের বদলে স্বাদবিহীন সাদামাটা খাবার খেয়ে জীবন পার করা। অনেকেই আবার ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যে স্পেশাল ডায়েট প্ল্যান বা স্পেশাল রেসিপির খোঁজ করেন। আসলে বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়। খাবারের বিষয়টা সবার জন্যেই প্রায় একই রকম। কেবল ডায়াবেটিস রোগীদেরই নয়, বরং সব মানুষেরই সুস্বাস্থ্যের জন্যে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাওয়া উচিৎ। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যে বিষয়টা একটু বেশি জরুরী।

খাবার তালিকা করার আগে একটু বুঝে নিতে হবে পুষ্টিকর বা সুষম খাবার বলতে আসলে কি বোঝায়। আমাদের দেহের নিত্য দিনের কাজ কর্ম করার জন্যে বিভিন্ন রকম খাদ্য উপাদানের প্রয়োজন হয়। এগুলোর মধ্যে প্রধান হলো কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, প্রোটিন বা আমিষ, ফ্যাট বা তেলজাত পদার্থ, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ লবণ। এগুলোর সবগুলোই দেহের জন্যে কোনো না কোনোভাবে দরকারি। তাই এ সবগুলো উপাদান প্রতিবেলার খাবারে উপস্থিত থাকলেই কেবল সেটা পুষ্টিকর বা সুষম খাবার বলে গণ্য হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্যের শক্তিমান বা ক্যালোরি।

কোনো খাবার গ্রহণ করার পরে তা থেকে দেহ কতোটুকু শক্তি পাবে বা কতোটুকু কাজ করতে পারবে, তার হিসেবই হলো ক্যালোরি। এটা নিয়েও অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে। অনেকেই যেমন এদিকে নজর না দিয়ে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করে মুটিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি অনেকেই আবার মনে করছেন ক্যালোরি মানেই বোধ হয় খারাপ কিছু। অনেকেই ওজন কমানো বা স্লিম হবার চেষ্টায় অতিরিক্ত লো ক্যালরির ক্রাশ ডায়েট গ্রহণ করেন। দুটোই শরীরের জন্যে ক্ষতিকর। আমাদের শরীরের প্রতিদিনের কাজের জন্যে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি দরকার হয়। সে শক্তিটুকু যেন প্রতিদিনের খাবার থেকে পাওয়া যায়, সেভাবেই ডায়েট প্ল্যান করা উচিৎ।

দৈনিক কার কতোটুকু ক্যালোরি দরকার, সে বিষয়ে ‘American National Institute of Health’ এর গাইডলাইনে বলা আছে, স্বাভাবিক ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে দৈনিক ১৬০০ থেকে ২০০০ ক্যালোরি এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১২০০ থেকে ১৬০০ ক্যালোরি খাবার গ্রহণ করা উচিৎ। তবে এই হিসেব সার্বজনীন নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম ও জীবনযাত্রার ধরণের ভিত্তিতে এটি কম বেশি হতে পারে। আপনার ডায়াবেটিস চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদ এ বিষয়ে আপনাকে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন। আগেই বলা হয়েছে, সুষম খাবারে সকল খাদ্য উপাদান সঠিক পরিমাণে উপস্থিত থাকতে হবে। অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস হলে মিষ্টি বা শর্করা জাতীয় খাবার একেবারেই বাদ দিতে হবে। কিন্তু এই শর্করাই আমাদের শরীরের শক্তির মূল উৎস। তাই এটি খাবারে থাকতেই হবে। তবে সেটা হতে হবে স্বাস্থ্যকর।

আমাদের খাবারের বড় অংশ বা প্রধান খাবারই হলো শর্করা। চাল, আটা, আলু, মিষ্টান্ন এগুলোই মূলত আমাদের শর্করার মূল উৎস। এসব খাদ্যের শর্করার গুণ বিচারের জন্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স নামে একটা স্কেল ব্যবহার করা হয়। আমরা যেসিব শর্করাযুক্ত খাবার খাই, তার সবগুলোই রক্তে গ্লুকোজ হিসেবে শোষিত হয়। যে খাবার খাবার পর যতো দ্রুত আমাদের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়ে, তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ততো বেশি। সাধারণত সরল শর্করা যেমন, গ্লুকোজ, চিনি, মিষ্টান্ন, কোমল পানীয়, মিষ্টি ফল এগুলো খুব সহজেই ভেঙে যায় ও দ্রুত রক্তে মিশে যায়। তাই এগুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি। আবার জটিল শর্করা যেমন লাল আটা, ভুট্টা, গোটা শস্য, মিষ্টি আলু এগুলো ভাঙতে অনেক সময় লেগে যায়, ফলে খাবার পরপরই হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায় না। এগুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম।

ডায়াবেটিস রোগীদের এরকম কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার বেছে নেয়া উচিৎ। তবে এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতে পারে। যেমন তিনি যদি ইনসুলিন নেন, বা উচ্চ মাত্রায় ডায়াবেটিসের ওষুধ খান আবার একই সাথে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার খেতে থাকেন, তাহলে হঠাৎ হাইপোগ্লাইসেমিয়া হবার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। তিনি সার্বিক দিক বিবেচনা করে আপনার জন্যে সঠিক খাদ্য তালিকা দিতে পারবেন। শর্করার পরেই আমাদের দেহ গঠনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্রোটিন বা আমিষ। মাছ মাংস বা ডাল জাতীয় শস্য থেকে আমিষ পাওয়া যায়। তবে উদ্ভিদজাত আমিষের তুলনায় প্রাণিজ আমিষের খাদ্যমান বেশি।

অনেকেই মনে করেন, আমিষ বেশি পরিমাণে খেলে কোনো সমস্যা নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। অন্য সব খাবারের মতো এটিও খেতে হবে পরিমাণমতো। বিশেষ করে যাঁদের কিডনীর সমস্যা আছে, তাঁদের প্রোটিন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া আজকাল বাজারে বিভিন্ন প্রোটিন ড্রিংক বা মিক্স পাওয়া যায়, বিশেষত যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের অনেকেই এগুলো ব্যবহার করে থাকেন। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যে এগুলো খুব ভালো খাবার নয়। কেননা এগুলো দেহে ইনসুলিনের কাজ করার হার বৃদ্ধি করে। ফলে হঠাৎ হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিতে পারে। তাই প্রাকৃতিক প্রোটিন উৎসের দিকেই নজর দেয়া উচিৎ। বিশেষ করে মাছ, মুরগির মাংস প্রাণিজ প্রোটিনের ভালো উৎস। রেড মিট বা গরু খাসির মাংসে প্রচুর ক্ষতিকর কোলেস্টেরল থাকায় এগুলো পরিমাণমতো খাওয়াই ভালো। তাছাড়া যাঁরা ভেজিটেরিয়ান, তাঁরা বিভিন্ন ধরণের ডাল থেকে নিত্যদিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন।

ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাদ্য দেহের তাপমাত্রা বজায় রাখতে বা ত্বকের লাবণ্যতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া কোলেস্টেরল আমাদের দেহ কোষের গঠনের একটা মৌলিক উপাদান। তবে ইদানিং এই কোলেস্টেরল বা ফ্যাট নিয়ে অনেকের মধ্যেই কনফিউশন দেখা যায়। আমাদের রক্তে মূলত দুই ধরণের লিপিড বা কোলেস্টেরল উপস্থিত থাকে। একটি হলো লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা এলডিএল, যেটি ‘ব্যাড কোলেস্টেরল’ নামেও পরিচিত, অন্যটি হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা ‘গুড কোলেস্টেরল’। মূলত স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাট ব্যাড কোলেস্টেরলের উৎস। রেড মিট যেমন গরু বা খাসির মাংস, চিংড়ি, ডিমের কুসুম এগুলোতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত বা প্যাকেটজাত খাবার, ডালডা বা ঘিয়ে ভাজা খাবারে থাকে ট্রান্স ফ্যাট। তাই এগুলো খেতে হবে বুঝেশুনে, পরিমাণমতো।

অন্যদিকে উদ্ভিজ্জ তেল যেমন অলিভ ওয়েল, এমন্ড ওয়েল, সূর্যমুখীর তেল, রাইস ব্যান ওয়েল এগুলোতে থাকে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, শরীরের জন্যে তেমন ক্ষতিকর নয়। তাছাড়া মাছের তেলে থাকে প্রচুর ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড, যা কিনা এইচডিএল বা গুড কোলেস্টেরলের ভালো উৎস। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কখনোই খাওয়া উচিৎ নয়। একজন মানুষের জন্যে মাসে ৭৫০ গ্রাম তেলই যথেষ্ট। ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ লবণ দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। রঙিন ফলমূল ও শাক সবজি এগুলোর প্রধান উৎস। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এগুলো অবশ্যই রাখা উচিৎ।

কোন খাবারে কী ধরণের পুষ্টি উপাদান থাকে বা দেহের জন্যে কোন খাবার কতোটুকু দরকারি, সেটা বুঝে শুনে খেলে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার নির্বাচন করতে সুবিধা হয়। তাই কেবল ডায়াবেটিস রোগীই নন, বরং সবারই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিৎ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Shopping Cart